টাইম মেশিন-২

বৃদ্ধ আইনস্টাইনকে পড়ন্ত বিকেলে টেলিফোন ঘরের সামনে চিন্তিত অবস্থায় পাওয়া গেল। রকিবুল সাহেব আইনস্টাইনকে হ্যাঁয়, হ্যালো কিছু বলার আগেই আইনস্টাইনই প্রথমে রকিবুল সাহেবকে ডাক দিলেন। রকিবুল সাহেব কাছে যাওয়া মাত্রই তিনি বললেন
: দয়া করে আপনি কি আমাকে আইনস্টাইন সাহেবের বাড়ির ঠিকানাটা দিতে পারেন?
রকিবুল সাহেব চরম অবাক হয়ে আইনস্টাইনকে বললেন
: আমার যদি ভুল না হয় আপনি ই তো আইনস্টাইন?
: হ্যাঁ, আমি ই আইনস্টাইন। দুর্ভাগ্যবশত আমি আমার বাড়ির ঠিকানাটা ভুলে গেছি। এমনকি আমার বাড়ির টেলিফোন নাম্বারটা ও।
: ও আচ্ছা।
: তুমি কি আমার বাড়ির টেলিফোন নাম্বারটা দিতে পার?
: না স্যার আমি আপনার বাড়ির টেলিফোন নাম্বার জানি না।
রকিবুল সাহেব এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন
: স্যার আপনার কোর্টের কি ভেতরের দিকে কোন পকেট আছে?
: হ্যাঁ আছে।
: সেখানটাই একবার খুঁজে দেখবেন?
আইনস্টাইনের চোখ দুটো হঠাৎ ঝলমল করে উঠল, তিনি উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে বললেন
: ইউরেকা, ইউরেকা, আমি তো টেলিফোন নাম্বারটা ভেতরের পকেটেই রেখেছিলাম।
আইনস্টাইন কোটের পকেট থেকে টেলিফোন নাম্বারটা বের করতে করতে বললেন
: ধন্যবাদ তোমাকে মি:—-
: স্যার আমার নাম রকিবুল হাসান।
আইনস্টাইন এদিক অদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন
: ভদ্রলোক, তুমি নাৎসি বাহিনীর কেও নও তো?
: না স্যার আমি খুবই ভাল মানুষ।
: ভেরি গুড। তাহলে তুমি আমাকে সাহায্য কর আমার বাড়ির নাম্বারটায় ফোন দাও তো।
রকিবুল সাহেব টেলিফোন ঘর থেকে আইনস্টাইনের বাড়িতে ফোন করলেন।
: স্যার রিং বাজছে ধরুন।
ওপাশ থেকে ফোন ধরা মাত্রই আইনস্টাইন বললেন
: হ্যালো, এটা কি আইনস্টাইন সাহেবর বাসা?
অন্যপাশ থেকে রং নাম্বার বলে ফোনটা কেটে দিল। আইনস্টাইন এবার নিজে নাম্বারটা নিয়ে ফোন করলেন
: হ্যালো?
ফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এলো
: কে?
: বলছি এটা কি আইনস্টাইন সাহেবের বাসা?
: না, রং নাম্বার
বলা মাত্রই ফোনটা আবার কেটে দিল ওপাশ থেকে। রকিবুল সাহেব আইনস্টাইনের দিকে তাকিয়ে বলল
: স্যার, এটা কি অন্য কারো নাম্বার?
: না, দুইবার যখন রং নাম্বার বলেছে তখন এটা আমার বাড়ির ই নাম্বার। আরও একবার ফোনের ডায়াল ঘোরাতে ঘোরাতে তিনি রকিবুল সাহেবকে বললেন
: সমস্যা হচ্ছে কি, নাৎসি বাহিনী যদি আমার বাড়ির নাম্বারকে ট্যাপ করে সেই জন্যই আমার বাড়ি থেকে বলছে “রং নাম্বার”
: ও আচ্ছা।
আইনস্টাইন এবার ওপাশ থেকে ফোন ধরা মাত্রই কোন প্রকার হ্যালো সম্বোধনে না গিয়ে বললেন
: আমি আলবার্ট আইনস্টাইন বলছি।
ওপাশ থেকে চাকর দারুণ অবাক হয়ে বলল
: আপনি, আপনি স্যার? হ্যাঁ, স্যার বলুন।
: আমি বাড়ির পথ, ঠিকানা ভুলে গেছি, তুমি কি এখানে এসে আমাকে নিয়ে যেতে পারবে?
: হ্যাঁ স্যার অবশ্যই। কোথায় আছেন আপনি প্লিজ বলুন।
: আচ্ছা শোন, তোমার আসবার আর দরকার হবে না, আমার সাথে আমার বন্ধু রকিবুল আছে তুমি ওকে বাড়ির ঠিকানা বলে দাও ও আমাকে পৌঁছে দেবে।
আইনস্টাইন রকিবুল সাহেবের দিকে তাকাতে তাকাতে বললেন
: কি রকিবুল সাহেব, পারবে না?
: হ্যাঁ স্যার অবশ্যই।
আইনস্টাইন ফোনটা রকিবুল সাহেবকে দেয়া মাত্রই তিনি বাড়ির ঠিকানাটা লিখে নিলেন।
: চল রকিবুল এবার যাওয়া যাক।
: হ্যাঁ চলুন স্যার।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আইনস্টাইন বললেন
: রকিবুল, তোমার হাতে ওটা কি?
: স্যার এটার নাম তবলা।
: ওটা দিয়ে কি করে?
: স্যার এটা একটা বাদ্যযন্ত্র, আমি আপনার জন্যই নিয়ে এসেছি।
আইনস্টাইন বেশ অবাক হয়ে বললেন
: আমার জন্য? বাদ্যযন্ত্র?
: জি স্যার, স্যার আপনার পছন্দ হয়নি এটা?
: পছন্দ হয়নি মানে? অবশ্যই হয়েছে, একটা ব্যাপার কি জানো রকিবুল?
: কি স্যার?
: বিখ্যাত হবার পর থেকেই আমাকে অনেকে অনেক কিছুই উপহার দিয়েছে, কোনটাই ঠিক আমার পছন্দ নয়, কিন্তু সত্যি বলতে কি তোমার উপহারটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
: থ্যাংক য়্যু স্যার।
: বুঝলে রকিবুল, কোন মানুষকে আসলে বিশেষ ভাবা উচিত নয়।
: কেন স্যার।
: কারণ কোন মানুষ ই সাধারণ নয়, সব মানুষই বিশেষ। আর সবাই ই যখন বিশেষ তখন একজনকে বিশেষ ভাবার দরকার কি?
রকিবুল সাহেব কথাটার মানে ঠিক বুঝল না। তার ভাব ভঙ্গি দেখে আইনস্টাইন বললেন
: বুঝতে পারলে না, তাইনা রকিবুল?
: ঠিক বলেছেন স্যার।
: No problem, আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। ধর এখন জার্মানি দলের সাথে যদি ব্রাজিলের ফুটবল খেলা হয় তবে কি আমাকে সে দলে ডাকবে?
: না ডাকবে না।
: কাদের ডাকবে?
: যারা ভাল ফুটবল খেলে।
: অর্থাৎ ফুটবলার হিসেবে জার্মান দলের ১৫ জন এই দেশে বিশেষ। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যাদেরকে আমরা হয়ত খুব সাধারণ মানুষ বলে ভাবি তাদের ভিতরেও এমন এমন অবাক গুণ আছে যা হাজার মানুষের মধ্যে নেই। এই জন্য বললাম আসলে আমরা সবাই বিশেষ, বুঝেছ?
: জি স্যার বুঝেছি।
কথা বলার এমন সময় আইনস্টাইন রকিবুল সাহেবকে নিয়ে ঘরে ঠুকলেন। রকিবুল সাহেব আইনস্টাইনের ঘরে ঠুকে ধাক্কার মত খেলেন। তিনি ভেবেছিলেন আইনস্টাইনের সারাঘর ভর্তি বিভিন্ন জ্ঞানের বই পত্র থাকবে, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি থাকবে, কিন্তু কিছুই নেই বরং সারাঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, গানের ক্যাসেট।
: রকিবুল?
: জি স্যার?
: তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে।
: Thank you, কিন্তু কেন স্যার?
: তোমার ভেতরে আশ্চর্য হবার দারুণ ক্ষমতা আছে, যেটা অধিকাংশ মানুষেরই নেই, এবং নেই বলেই তারা হয়ত আশ্চর্য হবার অভিনয় করে যেটা আমার কাছে আদিক্ষেতা মনে হয়। তাছাড়া তোমার সাথে আমার যে এক ঘণ্টা পরিচয় হল তার মাঝে তুমি রিলেটিভিটি কিংবা ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট নিয়ে কোন কথা বলনি।
আইনস্টাইন এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বললেন
: রকিবুল, আজ রাতে আমরা এক সাথে খেলে কেমন হয়?
: স্যার ভালই হয়।
: আজ রাতে আমার এখানে তোমার দাওয়াত, তুমি আর আমি একসাথে খাব, আচ্ছা?
: ঠিক আছে স্যার।
: তবে আমার সাথে খেতে তোমার সমস্যা হতে পারে।
: কি সমস্যা স্যার?
: আমি রাতে দূত খাই, এই ধর আটটা, সাড়ে আটটার দিকে।
: কোন সমস্যা নেই স্যার, আমার নিজেরও সকাল সকাল খাওয়া অভ্যাস।
: ভেরি গুড। এখন বাজছে সাড়ে সাতটা, চল রকিবুল এই এক ঘণ্টা তোমাকে আমার মিউজিক সংগ্রহ দেখায়।
: পরের একঘণ্টা রকিবুল সাহেব আইনস্টাইনের সঙ্গে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র দেখলেন। আইনস্টাইনের যে বিজ্ঞানের চেয়ে মিউজিক প্রীতিটা অনেকে বেশি সেটা আর বুঝতে বাকি রইল না রকিবুল সাহেবের। আইনস্টাইনের বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ দেখতে এবং সেখান থেকে রাতের খাওয়া শেষে ফিরতে প্রায় ১০টার মত বেজে গেল। কিন্তু টাইম মেশিন নামক যন্ত্রের পিরামিড যখন তার পকেটে তখন সময় নিয়ে ভেবে আর কি লাভ?

পছন্দের পোষ্টে যোগ করুন
ব্লগার ABsiddik লিখেছেন সবার ব্লগের জন্য এই লেখাটি , ব্লগার ABsiddik সবার ব্লগের জন্য মোট ব্লগ লিখেছেন ১৫ টি এবং মন্তব্য করেছেন 33 টি , তার বিষয়ে জানতে এবং অন্যান ব্লগ গুলো দেখতে ব্লগার ABsiddik এর প্রোফাইল দেখুন ।

এই ব্লগ পোষ্ট টির সকল বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই ব্লগার ABsiddik এর, এবং লেখাটির নৈতিক ও আইনগত দায়দায়িত্ব তাহার, এবং সকল মন্তব্যের দায়দায়িত্ব উক্ত মন্তব্যকারীর , সবার ব্লগ কর্তপক্ষ কোনোভাবেই দায়ী থাকবে না।

লেখাটি গল্প বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে.

৪ মন্তব্য রয়েছে “টাইম মেশিন-২ ব্লগ টি তে

  1. ইচঁড়ে পাঁকা বলেছেন : ডিসেম্বর ৬, ২০১১ at ১২:৩২ অপরাহ্ন

    গুড লেগেছে।

  2. পান্থ বলেছেন : ডিসেম্বর ৬, ২০১১ at ১:০৪ অপরাহ্ন

    এতো বড় লেখা । খালি ধুম আসে পড়তে গেলে

  3. অবিবেচক দেবনাথ বলেছেন : ডিসেম্বর ৬, ২০১১ at ৩:২৪ অপরাহ্ন

    পড়লাম, বেশ সবলিল ভাষায় লেখা।
    দৃষ্টি আকর্ষণ: দুত= দ্রুত।
    ধন্যবাদ।

  4. মি. পারফেক্ট বলেছেন : ডিসেম্বর ৬, ২০১১ at ৩:২৬ অপরাহ্ন

    ধীরে ধীরে পরতেছি , আগের টা কেবল পড়লাম

ব্লগটির বিষয়ে মন্তব্য লিখুন